ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ এর দ্বিতীয় রাজধানী শর্শদি

Mubarak Shah Second capital


ফেনী প্রতিনিধি, হাবীব মিয়াজী


বাংলায় প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতানাতের প্রতিষ্ঠাতা ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ। তিনি ১৩৩৮ থেকে ১৩৪৯ সাল বাংলার সুলতান ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁ। বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রাম এর পর ত্রিপুরা ও আরাকান রাজ্য জয়ের পর এ অঞ্চলে দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি ফেনী জেলার শর্শদিতে রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন।
পূর্ববঙ্গের স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের দ্বিতীয় রাজধানী শর্শদির অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনাই কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে একটি মসজিদ। মোঘল স্থাপত্যের নিদর্শন এই মসজিদে ফুটে উঠেছে উপমহাদেশের ইসলামিক স্থাপত্যের ঐতিহ্য!
বর্তমান স্থাপনাগুলোয় সাধারণত ছয় ইঞ্চি পুরু ওয়াল দেয়া হয়, তাজ্জব হয়ে দেখলাম, দুর্গের আদলে নির্মিত এই মসজিদের ওয়াল প্রায় পাঁচ ফুট পুরু। মসজিদটিতে এখন বাংলাদেশ প্রত্নতত্ন অধিদপ্তর ও জাদুঘরের অধিনে ন্যাস্ত একটি পুরাকির্তি সংরক্ষিত এলাকা।বাংলাদেশে ৪৭ টি প্রাচিন মসজিদকে প্রত্নতত্ন অধিদপ্তরের অধিনে নেয়া হয়েছে তার মধ্যে একটি এই মসজিদ। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রায় ৪৫০ বছর আগের এই মসজিদটির গায়ে ইটের উপর খাঁজ কেটে কেটে তৈরি করা হয়েছে সুনিপুন নকশা। লতা পাতা অঙ্কন করা হয়েছে সুনিপুন হাতে। গম্বুজের নিচে রয়েছে শৈল্পিক আবহ। দারুন কারুকার্যময় এই মসজিদের উপরে ৩ টি গম্বুজ বেষ্টিত, মসজিদের ঢোকার সম্মুখে দেয়াল ও চুন সুরকির শৈল্পিক আবহে নির্মিত।পুরো মসজিদটি চুন,সুরকি আর ইটের তৈরি। এর রক্ষণাবেক্ষণে একটি নোটিশ ছাড়া প্রত্নতত্ন অধিদপ্তরের আর কোন কর্মকান্ডের নিদর্শন পাওয়া যায়না। এমনকি মসজিদের নাম বা ইতিহাস নিয়ে কোন তথ্য কোথাও লিপিবদ্ধ নাই।
মাজার থেকে একশ গজ দূরে রয়েছে বিশাল মহামানিক্যের দীঘি। ত্রিপুরার রাজা প্রতাপ মানিক্য এই দিঘিটি খনন করেন। প্রতাপ মানিক্যের বাবা ছিলেন মহারাজা ধর্মমানিক্য। যিনি খনন করেন কুমিল্লার ঐতিহাসিক ধর্মসাগর দীঘি। ধর্ম মানিক্যের বাবা মহা মানিক্যের হাতেই ত্রিপুরা রাজবংশের সূচনা হয়। প্রতাপ মানিক্য ঠাকুরদা মহামানিক্যের নামেই এই দিঘির নাম করন করেন। স্থানীয় প্রবীণরা ছাড়া এই দিঘির নাম খুব কম মানুষই জানে। লোকে চিনে শর্শদি দিঘি নামে। অপূর্ব এই দিঘিটি বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ দিঘিগুলোর মধ্যে একটি।
মসজিদটির সামনে দিয়ে ঢাকা থেকে চট্ট্রগ্রাম পর্যন্ত চলে গেছে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ সড়ক। সড়কের পুর্ব দিকে রয়েছে ‘কল্লা শাহ্‌র’ মাজার নামে একটি প্রাচিন স্থাপনা (ছবিতে লাল রং)। এটারও কোন নেমপ্লেট বা ইতিহাস লিখা নেই। স্থানীয় এক প্রবীণ জানান- এই দিঘিটি ২২ দ্রোন, ২৩ কানি জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। ৪০ কানিতে এক দ্রোন আর ১২০ ডিসিমে (শতক) এক কানি। সেই হিসাবে দীঘিটি ১লাখ ৮ হাজার ৩৬০ শতক জায়গার উপর অবস্থিত। দীঘির যে ছবিটি দেখছেন এটি দিঘির চার ভাগের একভাগ। বাকি অংশ সরকারের উদাসীনতায় বেহাত হয়ে দুষ্ট চক্রের হাতে চলে গেছে। এই চার ভাগের এক ভাগকের আবার চারভাগ করে চারটি দীঘি করে কারা যেন লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছে।সরেজমিনে দেখলাম দীঘির দক্ষিনে প্রায় দুই একর জায়গা ভরাট করে সাইড ওয়াল নির্মান করা হচ্ছে।
আমাদের ঐতিহ্য আর প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণ ও অবিকৃত রাখার সার্থে অনতি বিলম্বে দিঘীটিকে দখলমুক্ত করা দরকার। অন্যাথায় প্রাচীন নিদর্শনটি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মহোদয়য়ের দৃষ্টি আকর্শন করছি।

SHARE THIS

0 Comments:

মতামতের জন্য ধন্যবাদ।